একটি সুন্দর ও আদর্শ সমাজ গঠনের ক্ষুদ্রতম একক হলো পরিবার। পরিবার যদি শান্তিময় হয়, তবে তার প্রভাব পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর পড়ে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক সংকট, দাম্পত্য কলহ এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটময় মুহূর্তে ড. ইয়াদ কুনাইবি রচিত ‘পারিবারিক সংকটে নবিজির উপদেশ’ বইটি আমাদের সামনে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। পারিবারিক সংকটের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানের এই যান্ত্রিক যুগে আমরা নবিজি (সা.)-এর সুন্নাহ এবং তাঁর জীবনদর্শন থেকে দূরে সরে আসছি। রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবল একজন নবি বা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, স্নেহময় পিতা এবং ধৈর্যশীল অভিভাবক।
তাঁর জীবনেও পারিবারিক নানা জটিলতা এবং সংকট এসেছে, কিন্তু তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং ইনসাফের সাথে সেই সংকটগুলো সমাধান করেছেন। এই বইটির আলোকে আমরা দেখতে পাই, পারিবারিক অশান্তির প্রধান কারণ হলো একে অপরের অধিকার সম্পর্কে উদাসীনতা এবং ধৈর্যহীনতা। নবিজি (সা.) শিখিয়েছেন যে, পরিবারের সদস্যদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা এবং তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা সদকা সমতুল্য।
দাম্পত্য জীবনের ছোটখাটো ভুলগুলোকে বড় করে না দেখে সেগুলোকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের জন্য সমানভাবে কার্যকর।
পারিবারিক সংকটের অন্যতম একটি দিক হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব। বর্তমান যুগে যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আমরা বাইরের জগতের সাথে যতটা সংযুক্ত, ঘরের মানুষের সাথে ততটাই বিচ্ছিন্ন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সাথে গভীর আত্মিক বন্ধন বজায় রাখতেন, তাদের মনের কথা শুনতেন এবং তাদের আবেগের মূল্যায়ন করতেন। তিনি কখনো তাঁর স্ত্রীদের ওপর হাত তোলেননি বা কটু কথা বলেননি। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ পারিবারিক ঝগড়া বা সংকটের সময় নবিজি (সা.)-এর প্রধান কৌশল ছিল শান্ত থাকা এবং রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া। তিনি শিখিয়েছেন যে, ক্রোধ ঈমানকে নষ্ট করে এবং সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করে।
ড. ইয়াদ কুনাইবি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে, রাসূল (সা.) কীভাবে তাঁর ঘরে কোনো মতভেদ তৈরি হলে তা অত্যন্ত কোমলতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে নিরসন করতেন। তিনি কখনো বিষয়টিকে ব্যক্তিগত ইগো বা অহংকারের পর্যায়ে নিয়ে যেতেন না। বিপরীতে, বর্তমান সময়ে আমরা সামান্য বিষয়েই একে অপরের প্রতি কঠোর হয়ে পড়ি এবং অহমিকার কারণে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাই না, যা শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদ বা দীর্ঘমেয়াদী অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রেও নবিজি (সা.)-এর উপদেশগুলো পারিবারিক সংকট উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান প্রজন্মের সন্তানদের বিপথে যাওয়া বা বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়া অনেক পরিবারের বড় সংকট। নবিজি (সা.) সন্তানদের সাথে স্নেহ ও বন্ধুর মতো আচরণ করার শিক্ষা দিয়েছেন।
তিনি শিশুদের সাথে খেলাধুলা করতেন, তাদের কপালে চুমু খেতেন এবং তাদের ছোট ছোট আবদারগুলো পূরণ করতেন। পারিবারিক অশান্তি যখন সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন সেই পরিবার তার ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। নবিজি (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা শিখি যে, শাসন আর আদরের সঠিক ভারসাম্যই পারে একটি সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট বা দারিদ্র্য অনেক সময় পরিবারের শান্তি কেড়ে নেয়। এমতাবস্থায় নবিজি (সা.) অল্পে তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করার যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা আমাদের মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
তিনি শিখিয়েছেন যে, সুখ বিলাসিতায় নয়, বরং অন্তরের সন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত। একটি সুখী পরিবার গড়ে তুলতে হলে নবিজির সুন্নাহ অনুযায়ী ঘরের মধ্যে ইবাদত ও দ্বীনি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। যখন একটি পরিবারের প্রতিটি সদস্য আল্লাহভীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন সেখানে ঝগড়া-বিবাদ কমে আসে এবং বরকত বৃদ্ধি পায়।
ড. ইয়াদ কুনাইবি-এর এই বইটিতে পারিবারিক জীবনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে কীভাবে নবিজি (সা.)-এর উপদেশগুলো আমাদের আধুনিক জীবনের জটিল সমস্যাগুলোরও সমাধান দিতে সক্ষম। পারিবারিক কলহ কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন এবং আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্কও এর অন্তর্ভুক্ত। নবিজি (সা.) আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং যারা এই বন্ধন ছিন্ন করে তাদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি শিখিয়েছেন যে, অন্য পক্ষ খারাপ ব্যবহার করলেও নিজের দিক থেকে সদাচরণ বজায় রাখাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। বর্তমান সময়ের ভঙ্গুর পারিবারিক কাঠামোকে মেরামত করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে নবিজি (সা.)-এর সেই সোনালী যুগে, যেখানে ভালোবাসা আর ত্যাগের মহিমায় প্রতিটি ঘর ছিল এক একটি জান্নাতের টুকরো। পরিশেষে বলা যায়, পারিবারিক সংকটের কোনো জাদুকরী সমাধান নেই, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যা ধৈর্য, সমঝোতা এবং সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে সম্ভব। যারা নিজেদের জীবনকে শান্তিময় করতে চান এবং পরিবারকে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তাদের জন্য ড. ইয়াদ কুনাইবি-এর এই বইটি এক অনন্য সংগ্রহ। নবিজি (সা.)-এর প্রতিটি উপদেশ ও হাদিস আমাদের শেখায় কীভাবে ছোট ছোট ত্যাগের মাধ্যমে একটি বড় সংকট এড়িয়ে যাওয়া যায় এবং একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দেওয়া যায়।
এই বইটির প্রতিটি পাতা আপনাকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে এবং আপনার পারিবারিক জীবনের অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখাবে। সুখী পরিবার কেবল একটি স্বপ্ন নয়, বরং এটি রাসূল (সা.)-এর পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে অর্জিত একটি বাস্তব নিয়ামত।
আরও বিস্তারিত জানতে বা মূল বইটি পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন: