জোর যার, মুল্লুক তার — এই ধারণা কেন ভুল? পশু-পাখীর গল্পের আয়নায় ন্যায়বিচারের শিক্ষা।
পোস্ট শিরোনাম: প্রাচীন ফার্সী সাহিত্যের পাঠ: আদর্শ মানুষ গড়ার গল্পে ন্যায়, নীতি ও সাহসের অপরিহার্যতা
ভূমিকা: গল্প কেন জরুরি?
মানবশিশুর মন-মানস গঠনে গল্পের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গল্প কেবল বিনোদন নয়, এটি জীবনের কঠিনতম নীতি ও আদর্শকে সহজভাবে মনের গভীরে পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বজুড়ে কিশোর ক্লাসিকগুলোতে পশু-পাখীর গল্প-কাহিনী এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে, কারণ এসব গল্পের মাধ্যমে শিশু তার ভেতরের জ্ঞান আহরণের আগ্রহকে প্রকাশ করে।
মুহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান রচিত ‘পশু-পাখীর গল্প-১’ গ্রন্থটি সমৃদ্ধ প্রাচীন ফার্সী সাহিত্যের দশটি আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় গল্পের সংকলন। পারস্যের জগৎখ্যাত ব্যক্তিত্ববর্গ এসব গল্প রচনা করেছিলেন মূলত শিশু-কিশোরদের আদর্শ, নীতিবান, উন্নত, কর্মঠ, সুশীল, সাহসী ও দৃঢ়চেতা মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। এই বইয়ের প্রথম গল্প ‘কাক ও কবুতর’—যা তুহাতুল ইয়ামিন থেকে সংগৃহীত—আমাদের সমাজে আজও বিদ্যমান এক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয়: ন্যায় প্রতিষ্ঠা কি চিৎকার ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব, নাকি দলিল ও প্রমাণের ভিত্তিতে?
মূল গল্প: কাক, কবুতর ও ন্যায়ের লড়াই
একদিনের ঘটনা। একটি কবুতর তার বাচ্চাকে উড়ান শেখাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বিশ্রামের জন্য একটি উঁচু গাছের ডালে থাকা একটি খালি বাসায় আশ্রয় নেয়। কবুতরের বাচ্চাটি বাসাটিকে ‘সবুজ গাছে সুখের ঘর’ বলে মুগ্ধ হয়।
কিন্তু এই বাসাটি ছিল একটি কাকের, যা সে আপাতত ছেড়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ফিরে এসে কবুতরের বাচ্চাকে বাসায় দেখে কাকটি “বেজায় রেগে গেলো” এবং কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। সে কবুতরটিকে ‘বজ্জাত বাচ্চা’ বলে গালি দিয়ে তার বাসায় বসার অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
কবুতর বিনয়ের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে কেবল ক্লান্তির জন্য কয়েক মিনিটের বিশ্রাম নিচ্ছে এবং সে “গাছে বসার পাখী নই, এখুনি চলে যাচ্ছি”। কিন্তু কাক তার অহংকারে অন্ধ হয়ে শান্তভাবে বিষয়টির মীমাংসা করতে নারাজ। সে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং বলে, “আমি এখন সকল পাখীকে ডেকে জমা করবো। কবুতর জাতের ইজ্জত নষ্ট করবো”। একপর্যায়ে কাক কবুতরের বাচ্চাকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে মাটিতে ফেলে দিলো।
৩. ন্যায়ের পথে কবুতর: ভীতি নয়, দৃঢ়তা
কাকের এমন অন্যায় ও সীমাহীন ত্রাস সৃষ্টির মুখে কবুতরটি এবার বেঁকে বসলো। সে বলল, “এতোই যখন হৈ চৈ ও ঝামেলা পছন্দ করো তাহলে তোমাকেই মজা দেখাবো। আসলেই এ বাসা আমার এখান থেকে এক পাও নড়বো না। যা পারো করোগে”।
কাকের সোরগোলে চারদিক থেকে পাখীরা এসে জমা হলো। কাক তখন চিৎকার করে মিথ্যা অভিযোগ করল যে কবুতর তার বাসা দখল করেছে এবং সে কবুতরকে “মেরে ফেলবো” বলে হুমকি দেয়।
কবুতর তখন সমস্ত পাখীদের সামনে সত্য তুলে ধরে:
কাক মিথ্যা বলছে, বরং কাকই অন্যায়ভাবে তার শিশু বাচ্চাকে বাসা থেকে ফেলে দিয়েছে।
কাক হাঁকডাক ও ত্রাস সৃষ্টি করে বাসা জবরদখল করতে চায়। কবুতর আহত বাচ্চাকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে ন্যায়বিচার দাবি করে।
৪. নীতি ও প্রমাণের জয়: সম্মিলিত বিচার
যখন পাখীরা কাককে জিজ্ঞেস করল, এই বাসা যে তার, তার কোনো “দলিল প্রমাণ” আছে কি না, তখন কাকটি প্রমাণ, সাক্ষী-সাবুদের কথা শুনে ঠাট্টা-মস্করা করে উড়িয়ে দেয়। সে কেবল তার ইচ্ছার জোরেই কবুতরকে তাড়াতে চাইল।
পক্ষান্তরে কবুতর প্রমাণ হিসেবে দেখালো:
তার আহত বাচ্চা। বাসাটি তখন তার অধিকারে ছিল।কাক যে অন্যায়ভাবে বলপ্রয়োগ করেছে। পাখীরা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো:
১. কাকের এভাবে চিল্লাচেল্লি করার কোনো অধিকার নেই।
২. কবুতরের বাচ্চাকে নিচে ফেলে দেওয়াটা “ভারী অন্যায় কাজ”।
৩. বনবাদাড়ে এভাবে গোলযোগ বাধানোর অনুমতি কাউকে দেওয়া হবে না।
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: “চেঁচামেচি করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সবকিছুরই একটা হিসাব নিকাশ আছে”।
পাখীরা কাককে জানিয়ে দিল, যদি তার কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই “কোন কাজীর কাছে বিচার চাইতে হবে”।
৫. আমাদের জন্য শিক্ষা
’কাক ও কবুতর’ গল্পটি আজকের সমাজের জন্য এক চরম বার্তা বহন করে। এই গল্পটি শেখায় যে:
বলের চেয়ে আইন বড়: সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কেবল গায়ের জোর বা উচ্চস্বরের মাধ্যমে নয়। অন্যায়কে মেনে নেওয়া উচিত নয়: কবুতর প্রথমে চলে যেতে চাইলেও, কাকের সীমালঙ্ঘন ও ত্রাসের জবাবে সে ন্যায়ের জন্য লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।
দলিল ও প্রমাণের গুরুত্ব: কাকের মৌখিক দাবি ও হুমকি ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ সে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। প্রমাণ এবং সত্যের কাছে মিথ্যা ও জোরজুলুম সবসময় পরাজিত হয়।
এই শিক্ষামূলক গল্পগুলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কেবল আদর্শ নাগরিক হিসেবেই নয়, বরং সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং নীতির প্রতি অবিচল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অপরিহার্য।
সম্পন্ন বইটা ফ্রী পড়তে বা ডাউনলোড করতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন।