শিশুরা কেন দুর্নাম কুড়ায়? বংশানুক্রম, পরিবেশ ও ইসলামী আদর্শের আলোকে সন্তানের আদর্শ জীবন গড়ার চাবিকাঠি
১. ভূমিকা: নয়নের মণি যখন অশান্তির কারণ
প্রতিটি মা-বাবার কাছেই সন্তান হলো নয়নের মণি, কলিজার টুকরা, নিষ্পাপ ফুলের মতো সুন্দর। বাবা-মায়ের একান্ত কামনা থাকে যে, সন্তান চরিত্রবান ও সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠুক। কিন্তু এই ঐকান্তিক কামনা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ছেলেমেয়েরা আশানুরূপ চরিত্র নিয়ে গড়ে ওঠে না। যখন সেই আদরের ধন সচ্চরিত্রবান না হয়, খাঁটি ঈমানদার না হয়, তখন মা-বাবারা অশান্তিতে জ্বলে মরেন। তখন প্রশ্ন জাগে, কেন এমন হয়?
অধ্যাপক মাযহারুল ইসলামের এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানি এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে। লেখকের মতে, এর মূল কারণ হলো সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে মা-বাবা এবং পরিবার ও পরিবেশের ভূমিকার বিভিন্নতা। যে শিশু একদিন ফুলের মতো সৌরভ ছড়ায়, সেই শিশুই বড় হয়ে যখন সমাজে ওঠে, তখন কেউ ছড়ায় সুবাস আবার কেউ কুড়ায় দুর্নাম আর ঘৃণা। আল্লাহ মানুষকে অতিব উত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু ভুল পরিবেশ ও কর্মের কারণে মানুষ সর্ব নিম্নস্তরে পৌঁছিয়ে যেতে পারে।
২. চরিত্র গঠনের দ্বৈত প্রভাব: বংশানুক্রম বনাম পরিবেশ
মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা শিশুর পরবর্তী ব্যক্তিজীবন ভালো বা মন্দরূপে গড়ে ওঠার পেছনে দুটি প্রধান কারণকে দায়ী করেন: বংশানুক্রম (Heredity) এবং পরিবেশ (Environment)।
ক. বংশানুক্রম (Heredity)
বংশানুক্রম হলো উত্তরাধিকার সূত্রে শিশু বাবা-মা এবং পূর্বপুরুষদের থেকে যেসব গুণাগুণ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। দৈহিক ও জৈবিক কিছু গুণ, যেমন লম্বা বা বেঁটে হওয়া, ফর্সা বা কালো হওয়া, এগুলো শিশু জন্ম নেওয়ার প্রায় নয় মাস পূর্বেই মাতৃগর্ভে ডিম্বকোষ ফলবতী হওয়ার সময় থেকে শুরু হয়। এই সহজাত গুণকে কখনো পরিবর্তন করা যায় না।
খ. পরিবেশ (Environment)
পরিবেশ হলো একটি শিশুকে যা বেষ্টন করে থাকে। জন্মের পর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যা কিছু ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করে, সেটাই পরিবেশ। পরিবেশের প্রভাবেই শিশুর মধ্যে বিভিন্ন রকম দোষ-গুণ এবং আচরণ ও ব্যবহারের সমাবেশ ঘটে। পরিবেশের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, ডাকাতের ছেলে ডাকাত না হয়ে ভালো মানুষ হতে পারে, আবার সূফী-দরবেশের ছেলেকে খারাপ মানুষ হতেও দেখা যায়।
নবী করীম (স.) বলেন, প্রত্যেক সন্তানই ফিরতের (সত্য কবুল করার যোগ্যতা) ওপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। এরপর তার পিতা-মাতা নিজেদের সংশ্রব দ্বারা তাকে ইহুদী, খৃস্টান বা অগ্নি উপাসক করে দেয়। যদি পরিবেশ তাদের অন্য পথে চালিত না করতো, তাহলে সকলেই সত্য (ইসলাম) কবুল করতো। পরিবেশবাদীগণ বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে কাদামাটির সাহায্যে যেমন ইচ্ছা তেমন পাত্র গড়া যায়, তেমনি শিশু সৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
৩. পরিবার ও পরিবেশের ভূমিকা: মূল চালক
শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবেশের গণ্ডি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে প্রাথমিক এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক হলো পরিবার ও গৃহের পরিবেশ।
বাবা-মা’র দায়িত্ব ও কর্তব্য
সন্তানকে সুন্দর, চরিত্রবান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতার কিছু প্রাথমিক দায়িত্ব রয়েছে, যা ইসলামে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:
১. উত্তম নাম রাখা: জন্মাবার পর সন্তানের জন্য উত্তম একটি নাম রাখতে হবে। সুন্দর নাম রাখা আল্লাহর হুকুম।
২. শিক্ষা ও নৈতিক চরিত্র গঠন: জ্ঞান, বুদ্ধি বাড়লে তাকে কুরআন ও দীন ইসলামের শিক্ষা দিতে হবে। পিতা-মাতার ওপর আল্লাহ তায়ালা এই ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য করেছেন।
৩. আকিকাহ ও খত্না: সন্তানের জন্ম উপলক্ষে আকিকাহ করা পিতামাতার প্রথম দায়িত্ব। ছেলেদের খত্না করাও ইসলামের সুন্নাত।
৪. স্নেহ-মমতা ও ভরণ-পোষণ: সন্তানকে দুধ পান করানো তাদের জন্মগত অধিকার। মায়েদের কর্তব্য পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করানো। সন্তানের প্রতি স্নেহ-মমতা দেখানো এবং হালাল রুজির দ্বারা তাদের লালন-পালন ও ভরণ-পোষণ করা অপরিহার্য।
৫. ন্যায়বিচার: সন্তানের প্রতি ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো এক সন্তানকে বেশি দেওয়া এবং কাউকে কম দেওয়া ঠিক নয়। হযরত উমর (রা.)-এর একটি হাদীস অনুসারে, সন্তানকে শিক্ষা না দেওয়া এবং তাদের প্রতি ন্যায়বিচার না করা পিতা-মাতার পারিবারিক দায়িত্ব সঠিকভাৰে পালিত না হওয়ার অপরাধের মধ্যে গণ্য।
খ. দাম্পত্য জীবন ও গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দাম্পত্য জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। সুসন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রচেষ্টা থাকতে হবে। গর্ভে সন্তান আসার সময় থেকেই মা-বাবা আল্লাহর কাছে সুন্দর সন্তানের জন্য প্রার্থনা করতেন।
মায়ের প্রভাব: গর্ভকালীন সময়ে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক অবস্থা, মায়ের চিন্তা-ভাবনা, রাগ, ধীরতা, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি গর্ভস্থ শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। একজন মনিষী বলেছেন, “If you give me a good mother, I shall give you a good nation”। তাই মা-বাবাকে হালাল রিজিক খাওয়া এবং প্রফুল্ল মন-মানসিকতা থাকার চেষ্টা করতে হবে।
গ. পরিবেশের আদর্শ: মানুষের বনাম আল্লাহর
শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবার ও পরিবেশের আদর্শকে অবশ্যই নির্ভেজাল হতে হবে।
মানুষের সৃষ্ট আদর্শ: মানুষের জ্ঞান, দুর্বলতা ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের তৈরি কোনো আদর্শই নির্ভেজাল ও কল্যাণময় নয়।
আল্লাহর দেওয়া আদর্শ: বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার দেওয়া আদর্শই কেবল নির্ভেজাল। তাই ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে সেই চিরন্তন ও শাশ্বত আদর্শ প্রদান করে। ইসলামের আদর্শ অনুশীলনই একটি সুন্দর মানুষ গড়ে তুলতে পারে।
৪. কিশোর-কিশোরী ও চ্যালেঞ্জ (বয়ঃসন্ধিকাল)
শিশুরা যখন বাবা-মায়ের কোল ছেড়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সহপাঠী ও খেলার সাথীর সাথে মিশে সামাজিক হয়ে ওঠে, তখন তাদের পরিবেশের গণ্ডি বেড়ে যায়। এই সময়েই আসে বয়ঃসন্ধিকাল (Adolescent period), যা মনোবিজ্ঞানীদের মতে ‘Period of storm and stress’। এই সময়ে ছেলেমেয়েরা যৌবনের সূচনা এবং চেতনার মধ্যবর্তী এক সঙ্কটময় অবস্থায় থাকে।
কিশোর-কিশোরীদের সামনে কোনো পূর্ণাঙ্গ আদর্শ নেই, কোনো লক্ষ্য নেই। তাই তাদের দরকার একটি পূর্ণাঙ্গ, ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বযুগের উপযোগী আদর্শের। ইসলামের আদর্শই কেবল সেই পূর্ণ, সম্পূর্ণ ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বযুগের উপযোগী লক্ষ্য ও আদর্শের জন্য পথনির্দেশ দেয়। বাবা-মা হিসেবে এই সময়টিকে গভীরভাবে চিন্তা করে পরিচালনা করাই হলো পরিণত মনের পরিচয়।
৫. উপসংহার: সন্তানের জীবনকে সুরভিত করার অঙ্গীকার
বাবা-মা হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সন্তানের জীবনকে সুখে ও শান্তিতে ভরে দিতে এবং তার পরকালে মুক্তি ও সুসংবাদ নিশ্চিত করতে, আমাদের নিজেদের জীবনকে ন্যায়, আদর্শ, সত্যবাদিতা ও সমাজসেবার মডেলে পরিণত করতে হবে।
সন্তানকে চরিত্রবান ও সুনাগরিকরূপে গড়ে তুলতে হলে পরিবার ও পরিবেশের প্রতিটি ধাপে সুসম্পর্ক, যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এবং সবচেয়ে জরুরি হলো: আল্লাহর দেওয়া আদর্শের অনুশীলন। এই প্রক্রিয়ায় জীবন সায়াহ্নে শান্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব।
সম্পন্ন বইটা ফ্রী তে ডাউনলোড করতে বা পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন।